বরিশাল প্রতিনিধি | বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 288 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ধান–নদী–খাল এই তিনে বরিশাল—প্রবাদটি যেন আজ বাস্তবতার কাছে হার মানছে। বরিশাল জেলার গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহমান একসময়ের খরস্রোতা টরকী–বাশাইল খালটি এখন নাব্য সংকট, দখল ও দূষণের কারণে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটির অস্তিত্ব সংকটে পড়ায় হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার কৃষি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাপন।
দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়ায় নদী ও খালের স্বাভাবিক নাব্য নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে নদী থেকে খালে স্বাভাবিকভাবে পানি প্রবেশ করতে পারছে না। এর পাশাপাশি কোথাও বাঁধ, কোথাও অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণ, খালের জায়গা দখল করে কাঁচা-পাকা স্থাপনা গড়ে তোলা এবং নির্বিচারে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে খালটির অবস্থা দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
একসময় টরকী–বাশাইল খাল ছিল এই অঞ্চলের প্রধান নৌপথ। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ার পর নৌপথের ব্যবহার কমে যায়। দীর্ঘদিন সংস্কার ও খননের অভাবে খালটি ধীরে ধীরে নাব্যতা হারায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বোরো ধান চাষে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে খালে একেবারেই পানি থাকে না। অথচ এই খালের পানির ওপর নির্ভর করেই প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়ে থাকে।
এই খালে মূলত আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা পলরদী নদী থেকে পানি প্রবেশ করে। কিন্তু শীত মৌসুমে নদীর পানির স্তর নিচে নেমে গেলে খালে পানি আসা বন্ধ হয়ে যায়। স্থায়ী সমাধান হিসেবে নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে নাব্য সমন্বয় করার প্রয়োজন থাকলেও তা না করে নদী ও খালের সংযোগ মুখে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম সেচ প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
ইজারার মাধ্যমে স্থানীয় ঠিকাদাররা এই সেচ প্রকল্প পরিচালনা করেন। নদী থেকে তোলা পানি কয়েক ধাপ হাতবদল হয়ে কৃষকদের কিনতে হয় চড়া দামে। এতে করে ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকেরা। বিকল্প হিসেবে অনেকেই পান চাষ ও মাছের ঘেরের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে ধান চাষের জমির পরিমাণ। আবার খালের নাব্য সংকটের কারণে বর্ষা মৌসুমে অল্প সময়ের টানা বৃষ্টিতেই খাল উপচে পড়ে পানিতে তলিয়ে যায় পানের বরজ ও মাছের ঘের।
একদিকে পানির অভাবে জমিতে চাষ করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে প্রতি ২০ শতাংশ জমির জন্য সেচ বাবদ ৩ শতাংশ ধান দিতে হয়। ধানের বাজারমূল্য কম হলেও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বর্গাচাষিরা জমি আবাদে অনীহা দেখাচ্ছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জমির মালিক ও প্রান্তিক কৃষকেরা।
এই খালটির ওপর নির্ভর করে একসময় বিপুলসংখ্যক মৎস্যজীবী তাদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। পাওয়া যেত অসংখ্য দেশি প্রজাতির মাছ। খালটি প্রায় মরে যাওয়ায় স্থানীয় মানুষ আজ দেশি মাছ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
খালটি স্রোতহীন হয়ে পড়ায় বদ্ধ পানিতে জন্ম নিচ্ছে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ নানা পানিবাহিত রোগের জীবাণু। যা এই অঞ্চলের জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ছাদের সরদার বলেন, শৈশবে এই খালে এত স্রোত ছিল যে সাঁতরে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়া কঠিন ছিল। এখান থেকেই মাছ ধরে সংসারের চাহিদা পূরণ হতো। এখন খাল মরে যাওয়ায় মাছও নেই, ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পানিও পাওয়া যাচ্ছে না।
পানি সেচ ব্লক ম্যানেজার শহীদ সরদার ও দুলাল ঢালী বলেন, ধান চাষের জন্য যে সময় পানির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই সময় খালে একেবারেই পানি থাকে না। দীর্ঘদিন কচুরিপানা পরিষ্কার না করায় জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক পানি প্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ধান চাষ বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
খালটি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা কৃষি বিভাগের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। গণমাধ্যমে একাধিকবার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি।
গত বোরো মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে খাল খননের আবেদন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে খালটি দখলমুক্ত ও পুনঃখননের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। কৃষি অফিস জানায়, একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে, তবে বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
কৃষিনির্ভর এই জনপদের মানুষের একটাই দাবি—খালটি দখল ও দূষণমুক্ত করে দ্রুত খননের মাধ্যমে নাব্য সংকট দূর করা এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা।
#MRA #SCSCNEWS