বুধবার ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
নিশিপথের নিঃসঙ্গ কান্না : আধরাত্রির অন্ধকারে হারানো হাসি

রাস্তায় হারিয়ে যাওয়া শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   172 বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

রাস্তায় হারিয়ে যাওয়া শিশু

মুহা. মীযানুর রহমান আদীব

-ফাইল ছবি

ঢাকার আধারাত্রি। শহরের আলো আর আধুনিক প্রযুক্তির ঝলকানি মগ্ন হয়ে আছে বিষম স্তব্ধতায়। মেট্রোরেলের ঢাকঢাক আওয়াজ বিদ্যুতের মতো বাতাসে ঝঙ্কার করছে, আর নগরের ব্যাংক কক্ষের জীবনে প্রতিদিন যেন অঙ্ক বেড়ে চলেছে। এসব আলোয় নির্মোহ আয়নায় ফুটপাথে বসে থাকা এক পথশিশুর খালি পেটে শুধুই শূন্যস্থান ছড়িয়ে আছে। আধুনিক ঢাকার গর্জনরত উচ্চশিখার ছায়ার ভেতরেই এই শিশুটির ক্ষুধার আওয়াজ সারা শহরকে কাঁপিয়ে দেয়, যেন আধুনিকতার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিঃশব্দ প্রতিবাদ।

গবেষণা ও বাস্তবতা :

বাংলাদেশে পথশিশুদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান বিপজ্জনক মাত্রায়। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী প্রায় ৩৪ লাখ পথশিশু আছে দেশে । জাতিসংঘের UNICEF-এর ‘Children Living in Street Situations 2024’ রিপোর্ট অনুসারে পরিবারের দেখাশোনা ছাড়াই রাস্তায় বসবাস করে প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন শিশু। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় প্রতি ৪০ জন শিশুর মধ্যে একজন রাস্তার কাঁধে জীবনের আশা বেঁধে আছে। অধিকাংশ পথশিশু (৮২%) দরিদ্রতার কারণে বা জীবিকা অর্জনের স্বার্থে রাস্তায় এসেছে।

রাস্তা জীবনের বাস্তবতা নৃশংস: প্রায় ৩০% পথশিশু কার্ডবোর্ড বা প্লাস্টিকের গাদার মধ্যে ঢাকা অবস্থায় শুয়ে রাত কাটায় । এক-তৃতীয়াংশ শিশুর কাজের সময়ে জখম হওয়ার খবর পাওয়া যায়, অর্ধেক সহিংসতার শিকার হয়। নিরক্ষরতার চূড়ান্ত হারে দেখা যায়, ৭১.৮% পথশিশু আদৌ পড়তে বা লিখতে জানে না। একই সময়ে রিপোর্টগুলো ইঙ্গিত দেয় উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন আয়ের মানুষের সামর্থ্য ছিন্ন করেছে — ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০% এবং দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.২%।
এই ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের পেটপুরে খাওয়া আজ বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবেগের কেন্দ্রে :

মধ্যরাতের একটা ফাঁকা রেলস্টেশন; ঠাণ্ডা হাওয়া আর দূরবতিতে নীরব আলো – ঠিক ওইখানে বসে আছে ছোট্ট একটি মৃদু মুখ। তার নাম মাহিদুল, বয়স ১৬। স্কুলের মাঠের স্বপ্ন নিয়ে শহরে এসেছিল সে, হালকা কাঁশি আর একঝাঁক পেন্সিল হাতে, কিন্তু এখন স্বপ্ন হয়ে গেছে ফুটপাথের শীতল ধুলো। কপালে জমেছে দিনভর সংগ্রহ করা প্লাস্টিক আর কাঠের টুকরো, হাতে এক ফাঁকা ব্যাগ, পেট খালি আর বুকটা ভেঙে দেওয়ার মতো নিঃসঙ্গতা। সে মৃদু গলায় বলল, “আমরা তো রাস্তায় থাকি, তাই কেউ আমাদের কিছু দেয় না। যদি আমি যতটুকু আবর্জনা সংগ্রহ করতে পারি, তাতে হয়তো দিনে দুবার খেতে পারি; নইলে অনাহারে থাকি”। এই কথার মধ্যে যেন জমে আছে তার পরাধীনতা আর ক্ষুধার সব ব্যথা।

আরেকটি শিশুর কথা ভাবি—নাম রাবিউল, বয়স ১৪। কামরাঙ্গীর পুরনো রেলস্টেশনের ধারে সন্ধ্যার আড়ালে সে একাকী বসে থাকে। কাঁপছে শরীর, হাতে দুটি ছেঁড়া কম্বল জড়িয়ে সে বুক ঢেকে দিয়েছে; মুখে ভেসে আছে শিশুসদৃশ বিনয়। একদিন সন্ধ্যায় সে বলল, “স্যার, যদি পারেন আমাকে একটা কম্বল কিনে দিন, আমার কম্বলটা কেউ চুরি করে নিয়েছে”। এই এক বাক্যে লুকিয়ে আছে হাজার অপ্রকাশিত প্রশ্ন—তার ছোট্ট চোখে কেন আঁধারের ছায়া, ভাঙা গলায় কেন আবেগ-সমৃদ্ধ নিঃশব্দ কান্না?

এই দুই উদাহরণ নয়; ঢাকা শহরের হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশুর হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অতল অসহায়তা। তাদের কোমল শিশুসদৃশ হাসি ঢেকে রাখে গাছের ছায়ার মতো বিষাদের চাপ। স্বপ্নগুলো কেবল স্বপ্নই থেকে যায়—গরম এক বেলা ভাতের স্বাদ, নরম এক ছায়াময় বিশ্রামের আশ্বাস। প্রতি সন্ধ্যায় তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে: “আমাদের অপরাধ কি শুধু এতটুকু যে আমরা রাস্তাতেই দিনান্ত করব?” নিঃসন্দেহে সত্যি, ফুটপাথের শিশুদের জীবন এখন একেকটি নগ্ন যন্ত্রণার নদী; আমাদের প্রিয় ঢাকা শহর শুধুই তাদের নির্মম প্রান্ত ধরে রেখেছে।

আমাদের লক্ষ্য : পথশিশু আশ্রয় কেন্দ্র

এই যন্ত্রণাময় দৃশ্যগুলো দেখেই আমি পথশিশু আশ্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার সংগঠন পথশিশু আশ্রয় কেন্দ্র, নিরলসভাবে কাজ করে পথশিশুদের পাঁচটি মৌলিক মানবাধিকারের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে: খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা এবং আশ্রয়।

আমাদের কর্মসূচি :

খাদ্য: নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার প্রদান করে পথশিশুদের ক্ষুধা মেটানো।
পোশাক: শীতের জন্য উষ্ণ জামাকাপড় ও জুতো দিয়ে তাদের শরীরকে স্নেহময় করে তোলা।
শিক্ষা: পথশিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করে শিক্ষাজগতে টিকিয়ে রাখার সুযোগ দেওয়া।
চিকিৎসা সেবা: প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা বিনামূল্যে প্রদান।
আশ্রয়: নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা, যাতে রাতে তারা আরাম করে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায়।

আমরা এগুলোতে কাজ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিয়ে তাদের দক্ষ করে তোলার প্রচেষ্টা করছি। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, সম্পূর্ণ অধিকারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া এদের জীবন বদলায় না। তাই আমরা একটি সমন্বিত আশ্রয় এবং শিক্ষা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি, যাতে পথশিশুরা পরিণত হতে পারে গর্বিত দক্ষ নাগরিক।

আমাদের ঠিকানা: উত্তর রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা ১২৩৬। ফোনঃ +8801939060135

আহ্বান :

পথশিশুদের এ অবহেলা আর চলতে নেই — আপনাকেও এগিয়ে আসতে হবে। তাদের নিঃশ্বাসহীন কান্না আমাদের হৃদয় থেকে মুছে যাবে না যতক্ষণ তারা মানবিক আশ্রয় না পায়। ভাবুন, যদি আপনার শিশুটি রাস্তায় পড়ে থেকে যায়, ত‌বে কি আপনি হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন? দয়া করে এই শব্দহীন আর্তনাদকে উপেক্ষা করবেন না।

আমরা আপনাদের কাছে দু’হাত জোড় করে অনুরোধ করছি: পথশিশু আশ্রয় কেন্দ্রের পাশে দাঁড়ান। আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন – হোক তা অর্থসহায়তা, স্বেচ্ছাসেবী সময় বা সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া। আপনার একটু সহানুভূতি এই শিশুদের অমানুষিক নিঃসঙ্গ জীবনে আলো দিতে পারে। নিজেদের সন্তান ভাবুন এই পথের প্রতিটি শিশুকে, আর তাদের জন্য হোন আশ্রয়-প্রদাতা।

আমাদের সম্মিলিত ভালোবাসা ও সাহস তাদের হাসি ফিরিয়ে আনতে পারে। এখনই দিন, এই ট্র্যাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে আমাদের সঙ্গে যোগ দিন – কারণ এই পথে থাকা শিশুরা একা নয়, আমরা আছি তাদের পাশে।


 

লেখক: মুহা. মীযানুর রহমান আদীব

প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক : পথশিশু আশ্রয় কেন্দ্র বাংলাদেশ


 

 

মন্তব্য করুন

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক :
মুফতী আব্দুল কুদ্দুস আজিজী
উপদেষ্টা :
এড. রফিকুল ইসলাম মুকুল
বার্তা সম্পাদক :
মো. কবির হোসেন
প্রকাশক :
পথশিশু আশ্রয় কেন্দ্র
প্রতিষ্ঠাতা/নির্বাহী পরিচালক :
মুহা. মীযানুর রহমান আদীব

বর্তমান অস্থায়ী ঠিকানা:

উত্তর রায়েরবাগ, রশিদবাগ (গ্যাস রোড) যাত্রাবাড়ী, ঢাকা–১২৩৬

মোবাইল : +88019126490666

ই-মেইল: scscnewsbd@gmail.com